Breaking news

কৃষি ঋণের নামে ব্যাংকের টাকায় এনজিওগুলোর ব্যবসা!
কৃষি ঋণের নামে ব্যাংকের টাকায় এনজিওগুলোর ব্যবসা!

কৃষি ঋণের নামে ব্যাংকের টাকায় এনজিওগুলোর ব্যবসা!

সরাসরি কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এনজিও’র মাধ্যমে ব্যাংকগুলো কৃষি ঋণ বিতরণ করছে। এর ফলে কৃষক ঋণ পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত সুদ গুনতে গিয়ে সর্বস্বান্ত্ব হচ্ছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকের শাখা ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকগুলো ইচ্ছে করলে তাদের এজেন্টের মাধ্যমে কৃষকের হাতে ঋণের টাকা পৌঁছে দিতে পারে। একইভাবে পাড়ায়-মহল্লায়, অলিতে-গলিতে মোবাইল ব্যাংকিং হচ্ছে। এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও ব্যাংকগুলো কৃষকদেরকে ঋণ দিতে পারে। অবশ্য মাত্র ২৬ শতাংশ কৃষক ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ পাচ্ছেন। আর বাকি ৬৩ শতাংশ কৃষককে ব্যাংকের ঋণ পেতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। আর এনজিওগুলো কৃষকদের ওপর এখনও ২০ শতাংশের বেশি হারে সুদ আরোপ করছে। যদিও এনজিওগুলো ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশেরও কম সুদে টাকা ধার নিচ্ছে।

 

গত কয়েক বছর ধরে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলে গ্রাম পর্যায়ে ব্যাংকগুলো শাখা খুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও ব্যাংকের ঋণ সেবার আওতায় আসতে পারছেন না কৃষকরা।

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় মোট কৃষি ঋণের ৭০ ভাগই বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কৃষি ঋণের নামে অর্থ নিয়ে ভিন্ন খাতে বিতরণ করছে অনেক এনজিও। এতে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে এনজিওগুলোর পকেটে। স্বল্প পরিসরে কিছু কৃষক ঋণ পেলেও ৯ শতাংশের পরিবর্তে সুদ গুনতে হচ্ছে ২৫ শতাংশ হারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনজিওর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও নীতিমালার দুর্বলতার কারণেই কৃষি ঋণের সুফল পাচ্ছেন না কৃষক।

 

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংকের এজেন্ট শাখাগুলো থেকে এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যখন কৃষকদের ঋণ দেওয়া শুরু হবে, তখন কৃষকের খরচ কমে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘এনজিওদের মাধ্যমে ঋণ নিলে কৃষকের খরচ বেড়ে যায় এটা যেমন সত্য, তেমনই কৃষকদের আর্থিক সেবার আওতায় আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এনজিওগুলোই। তবে এখন কম খরচে কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সব এজেন্ট ব্যাংক যদি সব গ্রামের কৃষকদের ঋণ পৌঁছানোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে কৃষক অল্প খরচে ঋণ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে এনজিওগুলোকে টিকে থাকতে হলে অল্প সুদে কৃষকের হাতে টাকা পৌঁছাতে হবে। সে জন্য তাদেরকেও  তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।’

কৃষকরা বলছেন, কাজ বাদ দিয়ে কোনও কৃষক ব্যাংকে-ব্যাংকে ঋণের ন্য  ঘুরতে পারেন না। তারা বলছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ভোগান্তি বেশি। বিশেষ করে কাগজপত্রের ঝামেলায় কৃষকরা যেতে চান না। এনজিও’র মাধ্যমে ঋণ পাওয়াটা সহজ। যে কারণে সুদ বেশি হলেও ঋণ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে এখনও মহাজন থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষক। আত্মীয় স্বজন বা অন্যান্য উৎস থেকেও ঋণ নিচ্ছেন প্রায় ৭ শতাংশ কৃষক। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড র‌্যুরাল স্ট্যাটিটিক্স ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২ কোটি ৭৫ লাখ পরিবারে জরিপ করে বিবিএস জানিয়েছে, তাদের ৪০ শতাংশ কোনও না কোনও উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে, এর মধ্যে ব্যাংক থেকে কৃষকরা সর্বোচ্চ গড়ে ৫৩ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছে। আর এনজিও থেকে ৩৯ হাজার টাকা, মহাজন থেকে ৪২ হাজার টাকা, আত্মীয়-স্বজন থেকে সাড়ে ৪১ হাজার টাকা ও অন্যান্য উৎস থেকে গড়ে ৩১ হাজার টাকা করে ঋণ নিচ্ছে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের পর্যাপ্ত শাখা না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে এনজিওগুলোর ওপর নির্ভর হতে হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এজেন্ট ব্যাংক এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আগামীতে আরও উন্নতি হবে। কৃষক অল্প সুদেই ঋণ নিতে পারবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, প্রাইভেট ব্যাংগুলোর শাখা গ্রামে বেশি নেই।

জানা গেছে, মহামারি করোনাভাইরাসের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় চলতি (২০২০-২১) অর্থবছরে কৃষকদের জন্য ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ রেখেছে ব্যাংকগুলো, যা গেল অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেশি।

এদিকে এই করোনার মধ্যেও অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ছয় হাজার ২৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন দেশের কৃষকরা, যা মোট কৃষি ঋণের ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আগের বছরে স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে কৃষকরা ওই তিন মাসে ফেরত দিয়েছিল চার হাজার কোটি ৩৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার কৃষরা ব্যাংকগুলোকে ২ হাজার কোটি টাকা বেশি ফেরত দিয়েছেন।

এদিকে নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এনজিও’র মাধ্যমে বিতরণের লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল রয়েছে। গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত এ তহবিল থেকে ৩৬টি এনজিও মাত্র ৯ শতাংশ সুদে ৯ হাজার ৮৮২ জনের মাঝে ২৭৬ কোটি টাকার ঋণ করেছে।

এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য যে তিন হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে, সেই স্কিমের টাকা তিনটি ব্যাংক থেকে নিয়ে বিতরণ করতে পারবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) বা এনজিওগুলো। আগে প্রতিটি এনজিও’র একটি ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়ার সুযোগ ছিল। গত ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট এ বিষয়ে নতুন করে  সার্কুলার জারি করেছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, ‘পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় কোনও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান অনধিক তিনটি ব্যাংক থেকে অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণকারী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঋণ গ্রহণ নিশ্চিতকল্পে উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রথম এবং ক্ষেত্রমতে প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাংকের কাছ থেকে গৃহীত ঋণ তথ্য সম্বলিত একটি ঘোষণাপত্র সর্বশেষ অর্থায়নকারী ব্যাংকের কাছে দাখিল করতে হবে।

নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলো ঋণ বিতরণ করছে। তিন বছর মেয়াদি এ স্কিমের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৯ শতাংশ। একক গ্রাহকের ক্ষেত্রে এ স্কিম থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা এবং গ্রুপভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাঁচ জনের সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণের আওতায় এককভাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং গ্রুপভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা।


Published: 2020-11-25 20:39:46   |   View: 1166   |  
Copyright © 2017 , Design & Developed By maa-it.com



up-arrow